অর্থনৈতিক ক্রাইম ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬
সারা বিশ্বে যখন সুইস ব্যাংকে আমানত বা অর্থ জমা রাখার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে কমছে, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ উল্টো এবং উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ও জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে রেকর্ড ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে দাঁড়িয়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (SNB) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা গত এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ নিট বৃদ্ধির এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান।
বৈশ্বিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক আইনি কড়াকড়ির কারণে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বৈশ্বিক আমানত কমলেও বাংলাদেশের এই উল্লম্ফন দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে প্রথাগত কঠোর গোপনীয়তার নীতির কারণে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখা নির্দিষ্ট বাংলাদেশি নাগরিক, ব্যবসায়ী বা আমলাদের নামের তালিকা এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচার (Money Laundering) নিয়ে দেশের আর্থিক খাতে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিদেশ থেকে পাচার হওয়া পুরোনো অর্থ ফেরত আনার জন্য নানামুখী আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে দেশ থেকে এই বিপুল পরিমাণ নতুন অর্থ পাচার হয়ে গেছে—যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তারা মনে করেন, দেশে সুশাসনের চরম অভাব এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় টাকা পাচারের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, "বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের পতনের পরেও অর্থ পাচার বিন্দুমাত্র থামেনি, বরং বেড়েছে। বর্তমানে প্রবাসীদের পাঠানো বৈধ রেমিট্যান্সের সমান্তরালে অবৈধ হুন্ডি ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ার কল্যাণে পাচারের পথ আরও সহজ হয়েছে। এই অন্তহীন অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারকে কেবল মুখে নয়, কাজে কঠোর হতে হবে। একদিকে নতুন করে পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং অপরদিকে আগে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা—উভয় দিকেই সমান জোর দিতে হবে।"
বাংলাদেশি আইন অনুযায়ী কোনো নাগরিকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া বিদেশি কোনো ব্যাংকে আমানত বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট রাখার বিন্দুমাত্র আইনি সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান:
"বৈধ কোনো অনুমোদন বা পারমিশন নিয়ে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সুইস ব্যাংকে এক টাকাও রাখেনি। দেশের আইন অনুযায়ী এমন কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। ফলে সুইস ব্যাংকে জমা হওয়া এই পুরো টাকাই মূলত অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। আমরা এই পাচার ঠেকাতে এবং আগের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করছি। তবে পাচারের অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সরাসরি সুইস ব্যাংকের সঙ্গে এখনো বাংলাদেশের কোনো সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষর হয়নি। আমরা মূলত অর্থ পাচার নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা 'এগমন্ড গ্রুপ' (Egmont Group)-এর মেম্বার হিসেবে তাদের প্ল্যাটফর্ম ও এমওইউ ব্যবহার করে আইনি তথ্য আদান-প্রদান করছি।"
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং সমাজের প্রভাবশালী কালোটাকার মালিকরা চরম অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এই শঙ্কা থেকেই তারা নিজেদের অবৈধ অর্থ নিরাপদে রাখার জন্য সুইস ব্যাংককে বেছে নেন। ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর, যে কারণে এই সময়ে দেশ থেকে পাচারের প্রবণতা রকেটের গতিতে বেড়েছিল।
গত এক দশকের সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের চিত্র (ফ্র্যাংক হিসেবে):
২০২৫ বছর শেষে: ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্র্যাংক (১ বছরে ৪১% বৃদ্ধি)
২০২৪ বছর শেষে: ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্র্যাংক
২০২৩ বছর শেষে: ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক
২০২২ বছর শেষে: ৫ কোটি ৫৩ লাখ ফ্র্যাংক
২০২১ বছর শেষে: ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক (এ যাবতকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড)
২০২০ বছর শেষে: ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক
(উল্লেখ্য, কোনো নাগরিক যদি সুইস ব্যাংকে নগদ টাকার বাইরে স্বর্ণালংকার, মূল্যবান শিল্পকর্ম বা অন্য কোনো দামি জিনিসপত্র লকারে জমা রাখেন, তবে তার আর্থিক মূল্যমান এই বার্ষিক আমানতের স্থিতির সাথে যোগ হয় না।)
দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত ও সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি সম্প্রতি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটির প্রতিবেদনে দেশ কাঁপানো তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ গত ৫ বছরে বাংলাদেশের দেওয়া মোট জাতীয় বাজেটের চেয়েও অনেক বেশি। আলোচ্য ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা করে পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির হিসাব অনুযায়ী, এই ১৫ বছরে পাচার হওয়া অর্থ দিয়ে দেশের বুকে অনায়াসে ৭৮টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো!
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশ থেকে মূলত ৪টি প্রধান এবং সুনির্দিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে:
১. ওভার ইনভয়েসিং (Over-Invoicing): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কাগজে-কলমে অনেক বেশি মূল্য দেখানো।
২. আন্ডার ইনভয়েসিং (Under-Invoicing): দেশ থেকে পণ্য রপ্তানির সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ বিদেশের ব্যাংকে রেখে দেওয়া।
৩. হুন্ডি ও ভিওআইপি (VoIP) ব্যবসা: প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশে না এনে তা বিদেশে ডলার হিসেবে রেখে দিয়ে সমপরিমাণ টাকা দেশে হুন্ডির মাধ্যমে বিতরণ করা।
৪. লাগেজ ও সরাসরি ডলার পাচার: বড় বড় সরকারি প্রজেক্টের ঘুস বা দুর্নীতির লেনদেন সরাসরি দেশের বাইরে ডলারে সম্পন্ন করা। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরাসরি ভিআইপিদের মাধ্যমে লাগেজে করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডলার পাচারের তথ্যও মিলেছে।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের মোট ২৫৬টি ব্যাংকে সারা বিশ্বের আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংক, যা আগের বছরের (৯৭,৭১২ কোটি) চেয়ে প্রায় ৮ হাজার কোটি ফ্র্যাংক কম।
বিশ্বে শীর্ষে: সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে এ বছরও প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য (১৮,৩৯০ কোটি ফ্র্যাংক) এবং দ্বিতীয় স্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৭,৩৬৫ কোটি ফ্র্যাংক)।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আমানত গত বছরের চেয়ে ২৭ কোটি কমে ৩২৩ কোটি ফ্র্যাংকে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের আমানত ৩৮ কোটি এবং নেপালের ৩১ কোটি ফ্র্যাংক। এই অঞ্চলের বাকি দেশগুলোর আমানত লাখের ঘরও ছাড়াতে পারেনি, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান একলাফে ৮৩ কোটির ঘর পার করেছে।
বর্তমানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর বিষয়ে বিশেষ ট্রাস্কফোর্স গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় পাচারকারীদের বিদেশের সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে ফ্র্যাঙ্কের এই রেকর্ড বৃদ্ধি প্রমাণ করে, পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক এখনো সরকারের চেয়েও শক্তিশালী।
| দেশ বা অঞ্চল | মোট আমানতের স্থিতি (সুইস ফ্র্যাংক) | গত এক বছরের প্রবণতা |
| বাংলাদেশ | ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্র্যাংক | প্রায় ৪১% বৃদ্ধি (দক্ষিণ এশিয়ায় ২য়) |
| ভারত | ৩২৩ কোটি ফ্র্যাংক | ২৭ কোটি ফ্র্যাংক হ্রাস |
| যুক্তরাজ্য | ১৮,৩৯০ কোটি ফ্র্যাংক | বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে |
| পাকিস্তান | ৩৮ কোটি ফ্র্যাংক | নিম্নমুখী |
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেশের আর্থিক খাতের দুর্নীতি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচারের সব এক্সক্লুসিভ খবরের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |